বাংলাদেশ বা কলকাতা থেকে যারা থাইল্যান্ডে সম্পত্তিতে বিনিয়োগের কথা ভাবেন, তাদের মাথায় প্রথমেই আসে ফুকেটের সমুদ্রমুখী কনডো কিংবা পাতায়ার ভাড়া-ভিলা। কিন্তু এর ছায়ায় লুকিয়ে থাকা একটি খাত এখন বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ছে, তা হলো শিল্প গুদামঘর। ব্যাংকক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে লজিস্টিকস স্পেসের ঘাটতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিদ্যমান গুদামঘরের মালিকরাই এখন ভাড়াটেদের সঙ্গে দর কষাকষিতে উপরের হাতে আছেন।
কুশম্যান অ্যান্ড ওয়েকফিল্ডের ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদন বলছে, ২০২১ সাল থেকে শিল্প জমির চাহিদা সরবরাহকে ছাড়িয়ে গেছে ১০ শতাংশের বেশি ব্যবধানে, যার ফলে জমির দাম ও ভাড়া দুটোই ক্রমাগত বাড়ছে। আবাসিক খাতের তুলনায় শিল্প সম্পত্তি স্থিতিশীলতা ও মুনাফা দুই দিক থেকেই এগিয়ে আছে। যারা এখনো সম্পত্তি বলতে শুধু 'সি-ভিউ কনডো' বা 'পুল ভিলা' বোঝেন, তাদের কাছে এই খাত অপরিচিত মনে হতে পারে, কিন্তু ঠিক এখানেই ২০২৬ সালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গল্পগুলোর একটি তৈরি হচ্ছে।
সংক্ষেপে মূল তথ্য
- থাইল্যান্ডে গুদামঘরের ইল্ড অবস্থান ও সম্পত্তির শ্রেণিভেদে বছরে ৮-১২%, যা আবাসিক কনডোমিনিয়ামের চেয়ে ২-৩ গুণ বেশি
- বর্তমান চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি আনুমানিক ১৫-২০%, নতুন প্রকল্পও এই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না
- ইস্টার্ন ইকোনমিক করিডোরে (EEC) গ্রেড এ গুদামের গড় ভাড়া মাসে প্রতি বর্গমিটারে ১৭৫-২০০ থাই বাত, যা বছরে ৫-৭% হারে বাড়ছে
- লিজের মেয়াদ সাধারণত ৩-৫ বছর, নির্দিষ্ট ইন্ডেক্সেশনসহ, ফলে নগদ প্রবাহ অনেকটাই অনুমানযোগ্য
- প্রধান লজিস্টিকস হাবগুলোতে দখলের হার ৯০%-এর বেশি
- মূল চাহিদার এলাকা: চনবুরি, সমুত প্রাকান, পাথুম থানি প্রদেশ এবং মোটরওয়ে ৭ ধরে বিস্তৃত করিডোর
কেন এত বেশি চাহিদা তৈরি হলো
থাইল্যান্ড সরকারের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প ইস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর (EEC), যা চনবুরি, রায়ং ও চাচোয়েংসাও প্রদেশ জুড়ে বিস্তৃত, গুদামঘর চাহিদার মূল চালিকাশক্তি। এই অঞ্চলে অবকাঠামো বিনিয়োগ ইতিমধ্যে ১.৫ ট্রিলিয়ন থাই বাত ছাড়িয়ে গেছে।
আরেকটি বড় কারণ হলো ই-কমার্স। থাইল্যান্ডের অনলাইন রিটেইল বাজারের আকার এখন আনুমানিক ৮৫০ বিলিয়ন থাই বাত, আর এই বাজারের প্রতি এক শতাংশ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরও লজিস্টিকস স্পেসের প্রয়োজন হয়। Shopee, Lazada এবং TikTok Shop, প্রতিটি প্ল্যাটফর্মই তাদের গুদামঘরের নেটওয়ার্ক বাড়াচ্ছে।
সরবরাহের দিক থেকে দেখলে, একটি টার্নকি গ্রেড এ গুদাম তৈরি করতে ৮-১৪ মাস সময় লাগে, যে গতিতে চাহিদা বাড়ছে তার সঙ্গে এই নির্মাণ-গতি মিলছে না। ব্যাংকক পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে সারাদেশে রেডি-বিল্ট ওয়্যারহাউস (RBW) মজুদ ছিল প্রায় ৬.০৫ মিলিয়ন বর্গমিটার এবং রেডি-বিল্ট ফ্যাক্টরি (RBF) মজুদ প্রায় ৩.৪২ মিলিয়ন বর্গমিটার, যা সরবরাহ ঠিক কতটা টানটান হয়ে আছে তা স্পষ্ট করে দেয়।
বিনিয়োগে কত টাকা লাগবে
আবাসিক সম্পত্তির তুলনায় এখানে প্রবেশমূল্য অনেক বেশি। ২,০০০ থেকে ৫,০০০ বর্গমিটারের একটি মানসম্মত গুদামের দাম পড়ে ৩০-৮০ মিলিয়ন থাই বাত (মোটামুটি ৮ লাখ থেকে ২২ লাখ মার্কিন ডলার)। এটা এমন কোনো অঙ্ক নয় যা সাধারণত একক প্রবাসী বিনিয়োগকারী নিজে বহন করেন, বরং প্রাতিষ্ঠানিক বা যৌথ বিনিয়োগের কাঠামোতেই এটা বেশি দেখা যায়।
তুলনামূলক ভাবে খরচ কম রাখার একটা পথও আছে, থাই শিল্প রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (REIT), যেমন WHA Premium Growth Freehold REIT বা AIMIRT, SET এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। এখানে মাত্র কয়েক হাজার থাই বাত দিয়েই গুদামঘর খাতে অংশগ্রহণ শুরু করা যায়, আর ডিভিডেন্ড ইল্ড থাকে বছরে ৬-৮%।
সম্পত্তি কর নিয়ে চিন্তার তেমন কারণ নেই, থাইল্যান্ডে বাণিজ্যিক সম্পত্তির ওপর কর ধার্য হয় মূল্যায়িত মূল্যের মাত্র ০.৩%, যা ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিদেশি হিসেবে মালিকানা কীভাবে সম্ভব
থাইল্যান্ডে বিদেশিদের সরাসরি জমির মালিকানা দেওয়া হয় না, আর গুদামঘরের সঙ্গে জমি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তাই এখানে তিনটি পথ সাধারণত ব্যবহৃত হয়:
- বিদেশি অংশগ্রহণসহ থাই লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা
- দীর্ঘমেয়াদি জমি লিজহোল্ড (৩০+৩০ বছরের নবায়নযোগ্য চুক্তি) নেওয়া
- তালিকাভুক্ত REIT-এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ করা
নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো প্রথমে REIT দিয়ে বাজার বুঝে নেওয়া, তারপর ধীরে ধীরে লিজহোল্ড কাঠামোর মাধ্যমে সরাসরি বিনিয়োগের দিকে এগোনো।
এই খাতের ঝুঁকি কোথায়
সবকিছুই যে গোলাপি তা নয়। এখানে মূল ঝুঁকিগুলো হলো: বিদেশি মালিকানার আইনি জটিলতা, একটি বা দুটি প্রধান ভাড়াটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, থাই বাতে আয় হওয়ায় মুদ্রা ঝুঁকি, এবং ৩-৫ বছরের মধ্যে নতুন প্রকল্প বাজারে আসায় সম্ভাব্য অতি-সরবরাহ। বন্যার ঝুঁকিও একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়, ২০১১ সালের বন্যায় আয়ুথায়ার আশপাশের শত শত শিল্প স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
কনডো বনাম গুদামঘর, তুলনা করলে কী দেখা যায়
| বিষয় | গুদামঘর | ব্যাংকক কনডো | ফুকেট ভিলা |
|---|---|---|---|
| গড় বার্ষিক ইল্ড | ৮-১২% | ৩-৫% | ৫-৭% |
| লিজের মেয়াদ | ৩-৫ বছর | মাস ভিত্তিক | মৌসুমভিত্তিক/মাসিক |
| ভাড়াটে | কর্পোরেট | ব্যক্তি | পর্যটক |
| মৌসুমি প্রভাব | নেই | কম | বেশি |
গুদামঘরের সুবিধা হলো দীর্ঘ লিজ, স্থিতিশীল আয় এবং পর্যটন-মৌসুম বা Airbnb প্রতিযোগিতার ঝামেলা না থাকা। অসুবিধা হলো বেশি প্রবেশমূল্য এবং পেশাদার সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, থাইল্যান্ডের গুদামঘর খাত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এখনো যথেষ্ট মূল্যায়িত হয়নি। কাঠামোগত সরবরাহ ঘাটতি, ই-কমার্সের বিস্ফোরক প্রবৃদ্ধি এবং EEC-তে সরকারের ধারাবাহিক বিনিয়োগ, এই তিনটি মিলে একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করেছে। যারা প্রথমবার এই বাজারে ঢুকতে চান, তাদের জন্য থাই শিল্প REIT দিয়ে শুরু করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ, তারপর বাজার বুঝে সরাসরি লিজহোল্ড বিনিয়োগের কথা ভাবা যেতে পারে। থাইল্যান্ড সম্পত্তি এক্ষেত্রে সঠিক কাঠামো ও অবস্থান বেছে নিতে সাহায্য করতে পারে।
উৎস: ব্যাংকক পোস্ট
