আপনি যদি ফুকেট বা ব্যাংককে একটা ভিলা কেনার কথা ভাবছেন এবং কেউ বলে থাকে যে 'থাই কোম্পানি খুলে দিলেই জমির মালিক হয়ে যাবেন', তাহলে এই খবরটা এখনই পড়া দরকার। থাই সরকার ২০২৬ সালে বিলাসবহুল সম্পত্তি বাজারে সরাসরি হানা দিয়েছে। মোট ১২৭ কোটি বাথ (প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের ৩৩টি বিলাসবহুল বাড়ি এখন তদন্তের আওতায়, কারণ সন্দেহ করা হচ্ছে এগুলো বিদেশি ক্রেতাদের জন্য নমিনি মালিকানা কাঠামো ব্যবহার করে কেনা হয়েছে।
সংক্ষেপে বললে: যারা বহু বছর ধরে এই 'থাই কোম্পানি রুট'-এ ভরসা করে সম্পত্তি কিনেছেন, তাদের জন্য এটা শুধু একটা খবর নয়, বরং কৌশল পুনর্বিবেচনা করার একটা স্পষ্ট সংকেত।
নমিনি মালিকানা আসলে কী?
ব্যাপারটা এরকম: একজন বিদেশি একটা থাই কোম্পানি রেজিস্টার করেন, যেখানে কাগজে-কলমে থাই নাগরিকদের হাতে নিয়ন্ত্রক শেয়ার থাকে, কিন্তু আসল সুবিধাভোগী থাকেন সেই বিদেশি ব্যক্তি। এই কোম্পানি জমি ও বাড়ি কেনে, আর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ও লাভ যায় বিদেশি শেয়ারহোল্ডারের কাছে। দশকের পর দশক ধরে এটা বাজারে এক ধরনের 'ধূসর নিয়ম' হিসেবে চলে আসছে। কিন্তু ২০২৬ সালে থাই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো শুধু সতর্কবার্তা দেওয়া থেকে সরে এসে বাস্তব ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে।
এক নজরে মূল তথ্য
-
৩৩টি বিলাসবহুল সম্পত্তি, মোট মূল্য ১২৭ কোটি বাথ, থাই কর্তৃপক্ষের তদন্তের আওতায়, মূলত ব্যাংককের পাত্তানাকান ও ক্রুংথেপ ক্রিথা এলাকায় কেন্দ্রীভূত, দ্য নেশন থাইল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী
-
এই তদন্তের মূল লক্ষ্য সেই নমিনি কাঠামো, যা বিদেশিরা থাইল্যান্ডের সরাসরি জমি মালিকানা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহার করেন
-
থাই ল্যান্ড কোড (সেকশন ৮৬) অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকদের সরাসরি জমি মালিকানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
-
নমিনি কাঠামো ব্যবহারের শাস্তির মধ্যে আছে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, ২০,০০০ বাথ পর্যন্ত জরিমানা, এবং ফরেন বিজনেস অ্যাক্টের অধীনে ফৌজদারি মামলা
-
এর পাশাপাশি ফুকেট, ফাংঙা ও ক্রাবিতে চালানো এক পৃথক দক্ষিণাঞ্চলীয় অভিযানে ৪৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং প্রায় ১০৫ কোটি বাথ মূল্যের সম্পত্তি, ৮৯টি জমির প্লট জুড়ে, জব্দ করা হয়েছে
-
বৈধ বিকল্পের মধ্যে আছে বিদেশি ফ্রিহোল্ড কোটার (প্রকল্পের সর্বোচ্চ ৪৯%) আওতায় কনডোমিনিয়াম কেনা, অথবা নবায়নযোগ্য ৩০ বছরের লিজহোল্ডে জমি নেওয়া
-
কনডোমিনিয়াম বাজার এই অভিযানের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রয়েছে
তদন্তের আওতায় ঠিক কী কী পড়ছে?
এই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু মূলত জমিসহ বাড়ি ও ভিলা, কনডোমিনিয়াম ইউনিট নয়। কারণ আইনি সমস্যাটা মূলত জমির মালিকানা থেকেই তৈরি হয়, কনডো ইউনিট থেকে নয়। তদন্তাধীন সম্পত্তিগুলোর গড় মূল্য প্রায় ৩৮৫ লক্ষ বাথ (প্রায় ১.০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা স্পষ্টভাবে প্রিমিয়াম ভিলা সেগমেন্টের দিকে ইঙ্গিত করে।
দ্য নেশন থাইল্যান্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই তদন্ত পরিচালনা করছে ল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট, সঙ্গে যৌথভাবে ডিপার্টমেন্ট অব স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন (DSI)।
ফুকেট, ফাংঙা ও ক্রাবিতে চালানো সমান্তরাল অভিযানে জড়িত ছিলেন ৫০০-র বেশি কর্মকর্তা, জারি হয়েছিল ৪০টি অনুমোদিত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এবং কার্যকর হয়েছিল ১৩টি তল্লাশি পরোয়ানা। এতে ধরা পড়েন ৪৮ জন সন্দেহভাজন, যার মধ্যে ২৭ জন থাই এবং ২১ জন বিদেশি নাগরিক, ইসরায়েল, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে, ব্যাংকক পোস্ট এবং দ্য ফুকেট নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৫ সালেই থাইল্যান্ড বিদেশি মালিকানাযুক্ত থাই কোম্পানিগুলোর উপর নজরদারি বাড়িয়েছিল, DBD (ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) সিস্টেমের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডার যাচাইয়ের নতুন নিয়ম চালু করে। বাজার বিশ্লেষকদের অনুমান, ফুকেটে বিদেশি মালিকানাধীন ভিলার ৭০% পর্যন্ত কোনো না কোনো ধরনের নমিনি ব্যবস্থার মাধ্যমে গঠিত।
তাহলে বিদেশিদের জন্য বৈধ উপায় কী?
ভালো খবর হলো, কনডোমিনিয়াম কেনার পথ এখনও সম্পূর্ণ খোলা। বিদেশিরা আইনসম্মতভাবে কনডোমিনিয়াম ইউনিট ফ্রিহোল্ডে কিনতে পারেন, যতক্ষণ প্রকল্পে মোট বিদেশি মালিকানা ৪৯% ছাড়িয়ে না যায়।
জমিসহ বাড়ির ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো লিজহোল্ড। এখানে নবায়নের সুযোগসহ ৩০ বছরের জন্য জমি লিজ নেওয়া হয়, যাতে কোনো বাজেয়াপ্তকরণের ঝুঁকি থাকে না। এটা আইনগতভাবে স্বীকৃত ও সুরক্ষিত একটি কাঠামো।
FAQ
থাইল্যান্ডে নমিনি মালিকানা প্রকল্প বলতে কী বোঝায়?
একজন বিদেশি একটা থাই কোম্পানি (থাই কোং লিমিটেড) খোলেন, যেখানে ৫১% শেয়ার কাগজে-কলমে থাই নমিনি শেয়ারহোল্ডারদের নামে থাকে। এই কোম্পানি জমি ও বাড়ি কেনে, কিন্তু আসল নিয়ন্ত্রণ ও সুবিধা যায় বিদেশি শেয়ারহোল্ডারের কাছে। থাই আইন এটাকে ফরেন বিজনেস অ্যাক্ট ও ল্যান্ড কোড এড়ানোর চেষ্টা হিসেবে গণ্য করে।
নমিনি কাঠামো ব্যবহারের শাস্তি কী?
ফরেন বিজনেস অ্যাক্ট (১৯৯৯) অনুযায়ী জরিমানা হতে পারে ১০ লক্ষ বাথ পর্যন্ত এবং/অথবা ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। ল্যান্ড কোড অনুযায়ী, লঙ্ঘন ধরা পড়ার ১৮০ দিনের মধ্যে জমি বাধ্যতামূলকভাবে বিক্রি করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে বিক্রি না হলে মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে চলে যায়।
নমিনির মাধ্যমে কেনা ভিলা কি হারানোর ঝুঁকি আছে?
হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবেই। লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে আদালত ছয় মাসের মধ্যে সম্পত্তি বিক্রির নির্দেশ দিতে পারে। ক্রেতা না পাওয়া গেলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়। এর নজিরও আছে, ২০২৪ সালে কোহ সামুইয়ে একাধিক ভিলা জব্দ করা হয়েছিল।
বিদেশি হিসেবে জমিসহ বাড়ি বৈধভাবে কিভাবে কেনা যায়?
সবচেয়ে সাধারণ ও নিরাপদ উপায় হলো লিজহোল্ড। আপনি ৩০ বছরের জন্য জমি লিজ নিতে পারেন, সঙ্গে আরও দুই মেয়াদ নবায়নের অধিকার থাকে, আর বাড়ির স্থাপনাটি আপনার নামে রেজিস্টার করা যায়। আরেকটি পথ হলো প্রকৃত (নমিনি নয়) থাই কোম্পানির মাধ্যমে কেনা, যেখানে সত্যিকারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও বৈধ থাই অংশীদার থাকে, তবে এই পথে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সহায়তা প্রয়োজন।
এই তদন্ত কি কনডোমিনিয়াম বাজারকেও প্রভাবিত করবে?
না। বিদেশিদের কনডোমিনিয়াম ইউনিট ফ্রিহোল্ডে মালিকানার আইনি অধিকার আছে, প্রকল্পের ৪৯% বিদেশি মালিকানা কোটার মধ্যে থেকে। এই নিয়ম কন্ডোমিনিয়াম অ্যাক্টে নির্ধারিত এবং নমিনি কাঠামোর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
থাইল্যান্ডের কোন এলাকাগুলোতে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি?
ফুকেট, কোহ সামুই, পাতায়া এবং হুয়া হিনে বিদেশি মালিকানাধীন বিলাসবহুল ভিলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, এবং স্বাভাবিকভাবেই সেখানেই নমিনি কাঠামো ও এই ধরনের অভিযানের ঘনত্বও সবচেয়ে বেশি।
এখনও কি থাইল্যান্ডে সম্পত্তি কেনা লাভজনক?
অবশ্যই, যদি আইনি কাঠামো সঠিক হয়। কনডোমিনিয়াম বাজার পুরোপুরি খোলা আছে, ব্যাংককে ভাড়া থেকে বার্ষিক আয় ৫-৭%, আর ফুকেটে পেশাদারভাবে পরিচালিত সম্পত্তিতে এই আয় ৮-১০% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। মূল কথা হলো লাইসেন্সপ্রাপ্ত আইনজীবীর সঙ্গে কাজ করা এবং ধূসর এলাকার কাঠামো এড়িয়ে চলা।
আমার যদি আগে থেকেই নমিনির মাধ্যমে সম্পত্তি থাকে, তাহলে কী করব?
দেরি না করে জমি আইনে বিশেষজ্ঞ একজন থাই আইনজীবীর পরামর্শ নিন। বিকল্পগুলোর মধ্যে আছে কোম্পানিটিকে নিয়ম মেনে পুনর্গঠন করা, লিজহোল্ডে রূপান্তর করা, অথবা আপনার এলাকায় যাচাই-অভিযান পৌঁছানোর আগেই সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া।
কেনার আগে আইনি কাঠামো কিভাবে যাচাই করব?
বিক্রেতার সঙ্গে সম্পর্কহীন একজন স্বতন্ত্র আইনজীবীর মাধ্যমে পর্যালোচনা করান। নিশ্চিত করুন যে থাই শেয়ারহোল্ডাররা বাস্তব ব্যক্তি, যাদের যাচাইযোগ্য আয় আছে, এবং কোম্পানিটি সত্যিকারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালায় ও কর দেয়।
এই অভিযানের ঢেউ কি ভিলার দামে প্রভাব ফেলবে?
স্বল্পমেয়াদে সেকেন্ডারি মার্কেটে সরবরাহ বাড়তে পারে, কারণ কিছু মালিক যাচাই-অভিযান তাদের এলাকায় পৌঁছানোর আগেই তাড়াহুড়ো করে বিক্রি করতে চাইবেন। যারা লিজহোল্ড ভিলা কম দামে কিনতে আগ্রহী, তাদের জন্য এটা একটা সুযোগের জানালা খুলে দিতে পারে।
শেষ কথা
বর্তমান পরিস্থিতিটা কোনো সংকট নয়, বরং বাজারের স্বাভাবিকীকরণ। থাইল্যান্ড ধীরে ধীরে বেশি স্বচ্ছতার দিকে এগোচ্ছে, আর যেসব বিনিয়োগকারী আইনের মধ্যে থেকে লেনদেন কাঠামো সাজান, তারাই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবেন। ২০২৬ সালের সবচেয়ে স্পষ্ট নিয়ম হলো: আইনগতভাবে সঠিক লেনদেন কাঠামো দামের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আইনি পরামর্শে কার্পণ্য করলে পুরো বিনিয়োগটাই হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।
থাইল্যান্ড সম্পত্তি-তে আমরা বাংলাভাষী ক্রেতাদের ঠিক এই কারণেই সবসময় বৈধ ও যাচাইকৃত কাঠামোর পরামর্শ দিই, যাতে আপনার বিনিয়োগ নিরাপদ থাকে।
সূত্র: দ্য নেশন থাইল্যান্ড
