মূল বিষয়বস্তুতে যান
গাইড

সিউল না ফুকেট: ২০২৬ সালে কোথায় সম্পত্তির চাহিদা বেশি নিরাপদ?

সিউল না ফুকেট: ২০২৬ সালে কোথায় সম্পত্তির চাহিদা বেশি নিরাপদ?
Photo: Enes Çelik / Pexels
সংক্ষেপে

সিউলের বাড়ির দাম বাড়ছে স্যামসাং-এর বোনাসের জোরে, আর ফুকেটে বাড়ছে বিদেশি পুঁজির স্রোতে। বাংলাদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য কোন বাজারটি বেশি লাভজনক ও স্থিতিশীল, তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ।

হুয়াসিয়ংয়ে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের এক ইঞ্জিনিয়ার বছরে ৮-১২ মাসের বেতনের সমান বোনাস পান, আর সেই টাকা সরাসরি চলে যায় সিউলের একটি অ্যাপার্টমেন্টের ডাউন পেমেন্টে। ঠিক একই সময়ে দুবাইয়ে বসে থাকা একজন বিনিয়োগকারী ফুকেটে একটি ভিলা কিনতে পাঠিয়ে দেন ৩৫০,০০০ ডলার। গল্প দুটো সম্পূর্ণ আলাদা, কিন্তু ফলাফল এক: বাড়ির দাম বাড়ছে। যিনি বিদেশে সম্পত্তিতে টাকা রাখতে চান, তার জন্য আসল প্রশ্ন হলো, এই চাহিদার পেছনে আসলে কী কাজ করছে, তার ওপর নির্ভর করেই ঠিক করা উচিত পরবর্তী বিনিয়োগ কোথায় হবে।

নিক্কেই এশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের রমরমা সরাসরি প্রভাব ফেলছে আবাসন বাজারে। স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের উত্থান আর কর্মীদের মোটা বোনাস মিলেমিশে রূপ নিচ্ছে সিউল ও দেশের তথাকথিত 'সেমিকন্ডাক্টর বেল্ট'-এর অ্যাপার্টমেন্ট কেনায়। এটা একেবারে চিরাচরিত মডেল: স্থানীয় আয় থেকে তৈরি হয় স্থানীয় চাহিদা। ফুকেট চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইঞ্জিনে, যার জ্বালানি হলো বিদেশি পুঁজি।

এক নজরে উত্তর

  • সিউলে বাড়ির দাম বছরে প্রায় ৫-৮% হারে বাড়ছে, যার পেছনে মূল কারণ সেমিকন্ডাক্টর খাতের কর্মীদের বোনাস
  • ফুকেটে প্রিমিয়াম কনডোমিনিয়াম সেগমেন্টে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮-১২%, যেখানে ক্রেতাদের ৮০%-এরও বেশি বিদেশি নাগরিক
  • কোরিয়ার মডেল দাঁড়িয়ে আছে একটিমাত্র শিল্পের ওপর: চিপের চাহিদা কমলে আবাসন বাজারও দ্রুত নিচে নামে
  • ফুকেটের পুঁজির উৎস ছড়ানো রাশিয়া, চীন, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে
  • ভাড়া থেকে আয় (rental yield) সিউলে ২-৩%, আর ফুকেটের পেশাদারভাবে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে তা ৬-৮%
  • মাঝারি মানের সিউল অ্যাপার্টমেন্টের শুরুর দাম প্রায় ৫০০,০০০ ডলার, সেখানে ফুকেটে ভালো মানের স্টুডিও ইউনিট পাওয়া যায় মাত্র ১৫০,০০০ ডলার থেকে

মূল তথ্য যা জানা দরকার

  • স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স ও এসকে হাইনিক্স মিলে দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপির প্রায় ২০% বহন করে। ভালো বছরে কোরীয় মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী কর্মীদের বোনাস বার্ষিক বেতনের ৫০-১০০% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে
  • ২০২৪ সালেই গড় সিউল অ্যাপার্টমেন্টের দাম ছাড়িয়ে গেছে ১০০ কোটি ওন (প্রায় ৭৫০,০০০ ডলার), ফলে বড় বোনাস পেলেও অনেক তরুণ পেশাজীবীর নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে এই বাজার
  • REIC থাইল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী ফুকেটে ২০২৫ সালে ১১,০০০-এরও বেশি কনডোমিনিয়াম লেনদেন হয়েছে, যার একটা বড় অংশ বিদেশি ক্রেতাদের হাতে
  • থাইল্যান্ডের আইন অনুযায়ী প্রতিটি প্রকল্পে ৪৯% বিদেশি মালিকানা কোটার আওতায় বিদেশিরা কনডো সরাসরি নিজের নামে (freehold) কিনতে পারেন; জমি ও ভিলার ক্ষেত্রে সাধারণত ৩০+৩০+৩০ বছরের লিজহোল্ড কাঠামো ব্যবহার হয়
  • ২০২৬ জুড়ে থাই বাথের বিনিময় হার ছিল ডলারপ্রতি ৩৩-৩৫ বাথের মধ্যে, যা ডলার বা রুবল-নির্ভর ক্রেতাদের জন্য প্রবেশমূল্য সহনীয় রেখেছে
  • ফুকেটে বছরে পর্যটক আসেন ১০-১২ মিলিয়ন, যা সারাবছর ধরে ভাড়ার চাহিদা টিকিয়ে রাখছে
  • ব্যাংকক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাইট ফ্র্যাংক থাইল্যান্ডের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ফুকেটের বিলাসবহুল আবাসন বাজার, বিশেষ করে পশ্চিম উপকূলের বাং তাও, লায়ান, কামালা ও চেরং তালাই-এ ব্র্যান্ডেড ভিলাগুলো, ২০২৬-এ থাইল্যান্ডের বাকি বাজারের চেয়ে এগিয়ে আছে, যদিও দেশের অন্যত্র স্থানীয় আবাসন চাহিদা মন্থর হচ্ছে
  • দক্ষিণ কোরিয়ার আবাসন বাজারে কড়া নিয়ন্ত্রণ আছে: দ্বিতীয় বাড়ির ওপর কর ১২-১৬% পর্যন্ত হতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমিয়ে দেয়। থাইল্যান্ডে এমন কোনো বাধা নেই

কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি ফুকেটের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন?

কোরিয়ার বাজার একটিমাত্র শিল্পের সঙ্গে বাঁধা। ২০২৩ সালে যেমন দেখা গেছে, সেমিকন্ডাক্টর খাতে চক্রাকার মন্দা এলেই বোনাস কমে যায় এবং ক্রেতাদের আগ্রহও কমে। অন্যদিকে ফুকেটের চাহিদা আসে দুনিয়ার কয়েক ডজন দেশ থেকে, একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্রেতার কাছ থেকে, বিনিয়োগকারী, স্থানান্তরকারী, ডিজিটাল নোমাড, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ। পুঁজির উৎস এভাবে ছড়ানো থাকায় বাজারটি অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক।

সিউলের অ্যাপার্টমেন্ট আর ফুকেটের কনডোর রিটার্ন কি সত্যিই তুলনা করা যায়?

সরাসরি তুলনা চলে না। সিউল মূলত মূলধনী মূল্যবৃদ্ধির (capital appreciation) বাজি, যেখানে ভাড়ার আয় খুবই কম (২-৩%)। ফুকেট সম্পত্তির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি ৬-৮% ভাড়া আয়ও এনে দেয়। মডেল দুটো একেবারে ভিন্ন: সিউল অনেকটা জুয়ার মতো, আর ফুকেট আয়-উৎপাদনকারী বিনিয়োগ।

ফুকেটে বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য শুরুর বাজেট কত?

ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি থাকা একটি নতুন কনডোমিনিয়ামে ভালো মানের স্টুডিওর দাম শুরু ১৫০,০০০ ডলার থেকে। প্রিমিয়াম ভিলার দাম শুরু হয় প্রায় ৪০০,০০০ ডলার থেকে। সাধারণত পেমেন্ট ধাপে ধাপে হয়, চুক্তির সময় ৩০-৫০% দিতে হয়, বাকিটা হ্যান্ডওভার পর্যন্ত কিস্তিতে।

থাইল্যান্ডে কি কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর বেল্টের মতো কিছু আছে?

হ্যাঁ, ইস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর (EEC), যা চনবুরি, রায়ং ও চাচোয়েংসাও প্রদেশ জুড়ে বিস্তৃত, সেখানে উৎপাদন ও ডিজিটাল অর্থনীতির অঞ্চল রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে এই সেগমেন্টের আকর্ষণ ফুকেট বা কোহ সামুইয়ের রিসোর্ট সম্পত্তির তুলনায় অনেক কম, কারণ সেখানে ভাড়ার মডেলটা অনেক বেশি সহজ ও স্বচ্ছ।

একজন বিদেশি থাইল্যান্ডে কীভাবে কনডোমিনিয়াম কিনতে পারেন?

বিদেশিরা একটি প্রকল্পের নির্ধারিত বিদেশি কোটার মধ্যে থেকে কনডো ইউনিটের সম্পূর্ণ ফ্রিহোল্ড মালিকানা রাখতে পারেন। টাকা অবশ্যই বিদেশ থেকে বিদেশি মুদ্রায় পাঠাতে হবে, যার ভিত্তিতে থাই ব্যাংক একটি FET (Foreign Exchange Transaction) ফর্ম ইস্যু করে। এই কাগজ ছাড়া মালিকানা নিবন্ধন করা যায় না।

একই টাকায় সিউল না ফুকেট, কোথায় বেশি সুবিধা?

সিউলে ৫০০,০০০ ডলারে পাবেন আবাসিক এলাকার একটি সাধারণ অ্যাপার্টমেন্ট, যেখানে ভাড়ার আয় হবে প্রায় ২%। একই বাজেটে ফুকেটে পাওয়া যাবে একটি পুল ভিলা, অথবা দুই থেকে তিনটি কনডোমিনিয়াম ইউনিট, যেগুলো মিলিয়ে বার্ষিক ভাড়া থেকে আয় হতে পারে ৩৫,০০০-৪০,০০০ ডলার। সংখ্যাগুলোই আসল কথা বলছে।

ফুকেটে দাম কমার সম্ভাবনা কতটুকু?

দ্বীপে সীমিত জমির জোগান, ক্রমবর্ধমান পর্যটক সংখ্যা আর বিদেশি পুঁজির অব্যাহত প্রবাহ, এসব মিলিয়ে দাম কমার তেমন কারণ দেখা যাচ্ছে না। বিজনেস টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদেশি ক্রেতারাই থাইল্যান্ডের সামগ্রিক আবাসন মন্দা সামলে রাখছেন, যা এখন দেশজুড়ে চতুর্থ বছরে গড়িয়েছে, আর ফুকেট দাঁড়িয়ে আছে দেশের সবচেয়ে আন্তর্জাতিক বাজার হিসেবে, ডেভেলপারদের জন্য প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। প্রতিটি বছরের দেরি একজন ক্রেতার ৮-১২% সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি হাতছাড়া করার কারণ হতে পারে। একটা ভালো কৌশল হলো নির্মাণ পর্যায়ে কেনা, যখন ডেভেলপাররা প্রায়ই চূড়ান্ত দামের চেয়ে ১৫-২৫% ছাড় দেন।

ফুকেটে সম্পত্তি দেখতে এলে ভ্রমণ পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত?

৩-৫ দিন সময় হাতে রাখুন। বড় বড় শহর থেকে সরাসরি ফ্লাইট আছে, আর মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ক্রেতাদের জন্য দুবাই হয়ে যাওয়াটাই সাধারণ রুট। যেসব এলাকা দেখতে চান তার কাছাকাছি থাকুন, যেমন বাং তাও, লাগুনা বা রাওয়াই। থাইল্যান্ড সম্পত্তির বিশেষজ্ঞরা পুরো ভ্রমণসূচি সাজিয়ে দিতে পারেন আপনার জন্য।

কোরিয়ার চিপ-শিল্পের উত্থান আর তার ঢেউ কীভাবে আবাসন বাজারে গিয়ে পড়ছে, এই গল্প একটা স্পষ্ট শিক্ষা দেয়: চাহিদার একটিমাত্র উৎসের ওপর নির্ভরশীল বাজার স্বভাবতই ভঙ্গুর। ফুকেটের শক্তি ঠিক এখানেই, পুঁজির একাধিক চ্যানেল, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে টাকা আসছে, যা কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ত্রৈমাসিক আয়ের সঙ্গে বাঁধা নেই। যিনি একইসঙ্গে রিটার্ন এবং স্থিতিশীলতা চান, তার জন্য সিদ্ধান্তটা মোটামুটি পরিষ্কার।

সূত্র: ব্যাংকক পোস্ট

সাধারণ প্রশ্ন

থাইল্যান্ডে বিদেশিরা কি সরাসরি জমি কিনতে পারেন?

না, বিদেশিরা সরাসরি নিজের নামে জমি কিনতে পারেন না। তবে কনডোমিনিয়াম ইউনিট প্রকল্পের ৪৯% বিদেশি কোটার মধ্যে সম্পূর্ণ ফ্রিহোল্ড মালিকানায় কেনা যায়। জমি বা ভিলার ক্ষেত্রে সাধারণত ৩০+৩০+৩০ বছরের লিজহোল্ড কাঠামো ব্যবহার করা হয়।

ফুকেটে সম্পত্তি কিনে ভাড়া থেকে কেমন আয় হতে পারে?

পেশাদারভাবে পরিচালিত ফুকেটের প্রকল্পগুলোতে সাধারণত বার্ষিক ৬-৮% ভাড়া আয় (rental yield) দেখা যায়, যেখানে সিউলে একই ধরনের আয় মাত্র ২-৩%। ফুকেটের ১০-১২ মিলিয়ন বার্ষিক পর্যটক এই ভাড়ার চাহিদা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশ বা ভারত থেকে থাইল্যান্ডে টাকা পাঠিয়ে সম্পত্তি কেনা কতটা জটিল?

টাকা অবশ্যই বিদেশ থেকে বিদেশি মুদ্রায় থাই ব্যাংকে পাঠাতে হবে, যার ভিত্তিতে ব্যাংক একটি FET (Foreign Exchange Transaction) সনদ ইস্যু করে। এই কাগজ ছাড়া কনডোর মালিকানা নিবন্ধন সম্ভব নয়, তাই লেনদেনের প্রতিটি ধাপ ব্যাংকের মাধ্যমে সঠিকভাবে নথিভুক্ত রাখা জরুরি।

ফুকেটে সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগের এলাকা কোনগুলো?

বাংকক পোস্ট ও নাইট ফ্র্যাংক থাইল্যান্ডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী পশ্চিম উপকূলের বাং তাও, লায়ান, কামালা ও চেরং তালাই এলাকার ব্র্যান্ডেড ভিলাগুলো ২০২৬ সালে থাইল্যান্ডের বাকি বাজারের চেয়ে ভালো পারফর্ম করছে।