মূল বিষয়বস্তুতে যান
গাইড

থাইল্যান্ডে নমিনি জমি মালিকানা: ২০২৬ সালে কী পরিবর্তন হলো

থাইল্যান্ডে নমিনি জমি মালিকানা: ২০২৬ সালে কী পরিবর্তন হলো
Photo: mirthe diender / Pexels
সংক্ষেপে

২০২৬ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের ভূমি বিভাগ পুরো দেশে নমিনি কোম্পানির মাধ্যমে জমি দখলের বিরুদ্ধে একক জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে। আইন বদলায়নি, বদলেছে প্রয়োগের মাত্রা, আর এটাই ফুকেটে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সরাসরি উত্তর: কী বদলেছে

থাইল্যান্ডে বিদেশিদের সরাসরি জমির মালিক হওয়া কখনোই বৈধ ছিল না, এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের মে মাসে ভূমি বিভাগ (Department of Lands) সারা দেশের প্রতিটি প্রাদেশিক ভূমি অফিসে তিনটি জরুরি সার্কুলার পাঠিয়েছে, যার মাধ্যমে নমিনি স্ট্রাকচার (Thai company দিয়ে বিদেশিদের জমি নিয়ন্ত্রণ) ধরার জন্য একটি একক জাতীয় ডাটাবেস তৈরি হচ্ছে। ফলে আগে যেখানে অফিসভেদে নিয়ম আলাদা ছিল, এখন পুরো দেশে একই চেকলিস্ট আর একই মানদণ্ড কার্যকর হবে।

যারা রাশিয়া, ইউরোপ কিংবা এশিয়ার অন্য দেশ থেকে বছরের পর বছর ধরে থাই কোম্পানির মাধ্যমে ফুকেট বা সামুইতে ভিলা কিনেছেন, তাদের জন্য এটা একরকম হিসাব মেলানোর সময় এসে গেছে। বাংলাদেশ থেকে যারা থাইল্যান্ডে সম্পত্তি কেনার কথা ভাবছেন, তাদের জন্যও এই খবরটা শুরুতেই জেনে রাখা জরুরি, কারণ ভবিষ্যতে কনডো ছাড়া অন্য কোনো পথে জমি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এখন অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

মূল তথ্যগুলো এক নজরে

  • ২০২৬ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের ভূমি বিভাগ তিনটি সার্কুলার জারি করেছে, যা দেশের সব প্রাদেশিক ভূমি অফিসে পাঠানো হয়েছে।
  • ২০ লক্ষ থাই বাত (প্রায় ৫৭,০০০ ডলার) বা তার বেশি নগদ লেনদেন এবং ৫০ লক্ষ থাই বাতের (প্রায় ১,৪৩,০০০ ডলার) বেশি সম্পদ থাকলে ল্যান্ড কোডের আর্টিকেল ৭৪ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থের উৎস ও আর্থিক অবস্থার পর্যালোচনা শুরু হবে।
  • একমাত্র বৈধ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্তি এই স্বয়ংক্রিয় পর্যালোচনা থেকে ছাড় পাবে।
  • জমির মালিক এমন প্রতিটি আইনি সত্তার (কোম্পানি) তথ্য নিয়ে একটি একীভূত ডাটাবেস তৈরি হচ্ছে, যেখানে থাকবে নিবন্ধনের তারিখ, জমি কেনার তারিখ, মূল্যায়িত দাম এবং ব্যবসার ঘোষিত উদ্দেশ্য।
  • নির্দিষ্ট সীমার বেশি বিদেশি শেয়ার থাকা কোম্পানিগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে গভীর তদন্ত করা হবে।
  • বাড়তি যাচাইয়ের মধ্যে থাকছে শেয়ারহোল্ডার রেজিস্ট্রি বিশ্লেষণ, ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট (DBD)-এর সঙ্গে ক্রস-চেক, আর্থিক বিবরণী ও চুক্তিপত্র পরীক্ষা, এমনকি সম্পত্তিতে সরাসরি পরিদর্শন
  • আঞ্চলিক প্রপার্টি রিপোর্ট অনুযায়ী, ফুকেট, কোহ সামুই, কোহ ফাংগান ও ক্রাবির মতো পর্যটন এলাকায় ইতিমধ্যে ১১,০০০-এর বেশি কোম্পানি পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।

পটভূমি: কেন এই নমিনি স্ট্রাকচার এত জনপ্রিয় হলো

থাইল্যান্ডের ১৯৫৪ সালের ল্যান্ড কোড অনুযায়ী কোনো বিদেশি সরাসরি জমির মালিক হতে পারেন না। একটি ভবনে বিদেশি মালিকানার ৪৯% কোটার মধ্যে থেকে কনডোমিনিয়াম ইউনিট কেনা সম্ভব, কিন্তু ভিলা বা জমির প্লট সরাসরি কেনা যায় না। এটাই আইনের মূল কথা।

গত দুই দশকে এই নিয়ম এড়ানোর একটা পুরো শিল্পই গড়ে উঠেছে। পদ্ধতিটা ছিল সহজ: একটি থাই লিমিটেড কোম্পানি খোলা হয়, যেখানে বিদেশি ৪৯% শেয়ারের মালিক থাকেন আর বাকি ৫১% থাকে নমিনি হিসেবে থাই শেয়ারহোল্ডারদের কাছে। এই কোম্পানি জমি কেনে, আর বিদেশি সেখানে বাস করেন। বছরের পর বছর ধরে ল আ ফার্ম, এজেন্ট, এমনকি কিছু ডেভেলপারও এই স্ট্রাকচারকে একদম স্বাভাবিক সমাধান হিসেবে বিক্রি করে এসেছে।

কর্তৃপক্ষ এই প্র্যাকটিসের কথা সবসময়ই জানত। ল্যান্ড কোডের আর্টিকেল ৯৬ অনুযায়ী কোনো বিদেশিকে মালিকানার নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল এবং ২০,০০০ থাই বাত পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ ছিল বিরল আর অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এক ভূমি অফিস প্রশ্ন ছাড়াই লেনদেন নিবন্ধন করত, আবার আরেকটি অফিস একেবারে প্রত্যাখ্যান করত। সবকিছু নির্ভর করত কোন প্রদেশ, কোন কর্মকর্তার মেজাজ, আর কাগজপত্র কতটা যত্ন করে সাজানো হয়েছে তার ওপর।

এই নতুন নিয়ম বাস্তবে কীভাবে কাজ করবে

২০২৬ সালের মে মাসের সার্কুলারগুলো ঠিক এই অসামঞ্জস্যতাকেই লক্ষ্য করে তৈরি। প্রথমবারের মতো একটি সিস্টেমেটিক পদ্ধতি আনা হচ্ছে: একটি ডাটাবেস, একই মানদণ্ড, একই চেকলিস্ট। এই নতুন নির্দেশনার প্রথম বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রকাশ করা ল ফার্ম Silk Legal-এর মতে, এটি আইনের পরিবর্তন নয়, বরং প্রয়োগের একত্রীকরণ।

একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। ধরা যাক দুইজন থাই শেয়ারহোল্ডার আর ৪৯% শেয়ার নিয়ে একজন বিদেশি শেয়ারহোল্ডারের একটি থাই কোম্পানি ফুকেটে ১৫০ লক্ষ থাই বাত দিয়ে একটি ভিলা কিনেছে। আগে ভূমি অফিস কোনো প্রশ্ন ছাড়াই এই লেনদেন নিবন্ধন করত। এখন সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই কোম্পানিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করবে। কর্মকর্তারা শেয়ারহোল্ডার রেজিস্ট্রি টেনে দেখবেন, থাই সহ-মালিকরা কারা, তাদের পেশা কী, টাকার উৎস কোথায়, কোম্পানিটি সত্যিকারের ব্যবসা চালায় নাকি শুধু একটি সম্পত্তি ধরে রাখার জন্যই তৈরি। প্রয়োজনে একজন পরিদর্শক সরাসরি সম্পত্তিতে গিয়ে দেখবেন সেখানে আসলে কে থাকেন।

২০ লক্ষ থাই বাতের নগদ লেনদেনের সীমাটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। থাইল্যান্ডে, বিশেষ করে রিসোর্ট এলাকা আর রিসেল মার্কেটে, নগদে সম্পত্তি কেনাবেচা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। এখন এমন প্রতিটি লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থের উৎস যাচাইয়ের আওতায় আসবে, যা অ্যান্টি-মানি-লন্ডারিং আইনের (AMLA) সঙ্গে মিলে অস্বচ্ছ লেনদেনের জন্য আরেকটি বাধা তৈরি করছে।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট এবং যাদের আগের সম্পত্তি নিয়ে দুশ্চিন্তা

থাইল্যান্ড একা নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ বিদেশি সম্পত্তি মালিকানার ওপর নজরদারি কড়া করছে। ভিয়েতনাম ২০২৪ সালে তাদের হাউজিং আইন হালনাগাদ করে বিদেশি ক্রেতাদের জন্য নতুন নিষেধাজ্ঞা যোগ করেছে। ইন্দোনেশিয়াও বালিতে বিদেশি ক্রেতাদের জন্য নিয়মিত নিয়ম পরিবর্তন করে। তবে থাইল্যান্ডের পদ্ধতি একটু আলাদা, এখানে নিয়ম বদলাচ্ছে না, বদলাচ্ছে শুধু প্রয়োগের কঠোরতা।

যারা ইতিমধ্যে নমিনি স্ট্রাকচারের মাধ্যমে জমি ধরে রেখেছেন, তাদের অবস্থা এখনো অনিশ্চিত। সার্কুলারগুলো মূলত নতুন লেনদেন আর বিদ্যমান বেসের যাচাইকে লক্ষ্য করেই তৈরি, কিন্তু যে ডাটাবেস গড়ে উঠছে তাতে জমির মালিক প্রতিটি আইনি সত্তাই অন্তর্ভুক্ত, এমনকি বহু আগে করা লেনদেনও। অর্থাৎ দশ বছর আগে একটি ভিলার জন্য খোলা কোম্পানিও এখন পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে।

এখন কী করা উচিত

প্রথমত, একজন যোগ্য থাই আইনজীবীর মাধ্যমে বিদ্যমান স্ট্রাকচারের অডিট করিয়ে নিন। দ্বিতীয়ত, বিকল্প পথ বিবেচনা করুন: দীর্ঘমেয়াদি লিজহোল্ড (রিনিউয়াল অপশনসহ ৩০ বছর), বিদেশি কোটার মধ্যে কনডোমিনিয়াম মালিকানা, অথবা থাইল্যান্ড বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট (BOI)-এর মাধ্যমে বিনিয়োগ, যা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিদেশিদের সরাসরি জমির মালিক হতে অনুমতি দেয়।

ভূমি বিভাগের এই নতুন নির্দেশনা একটা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: বিক্ষিপ্ত আর অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রয়োগের যুগ শেষ হচ্ছে। থাই সম্পত্তিতে যাদের বিনিয়োগ আছে, দরজায় পরিদর্শক আসার অপেক্ষা না করে এখনই তাদের মালিকানা কাঠামো পর্যালোচনা করা উচিত। এই ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ড সম্পত্তি-র মতো স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, বিশেষত আইনি কাঠামো বাছাইয়ের সময়।

সূত্র: The CITY Asia

সাধারণ প্রশ্ন

থাইল্যান্ড কি ২০২৬ সালে বিদেশিদের সম্পত্তি কেনা নিষিদ্ধ করেছে?

না, আইনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিদেশিরা এখনো ৪৯% বিদেশি কোটার মধ্যে থেকে কনডোমিনিয়াম কিনতে পারবেন। সরাসরি জমি মালিকানার নিষেধাজ্ঞা কয়েক দশক ধরেই আছে, নতুন যা এসেছে তা হলো এর কঠোর ও সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রয়োগ।

নমিনি স্ট্রাকচার আসলে কী এবং এটা কেন এখন ঝুঁকিপূর্ণ?

এটি এমন একটি থাই কোম্পানি যেখানে ৫১% শেয়ার থাই নাগরিকদের নামে থাকে নমিনি হিসেবে, আর প্রকৃত মালিক থাকেন ৪৯% শেয়ারধারী বিদেশি। এই ব্যবস্থা সবসময়ই আইনি ধূসর অঞ্চলে ছিল, এখন একীভূত ডাটাবেস আর মানসম্মত যাচাইয়ের মাধ্যমে এগুলো সহজেই শনাক্ত হবে।

কত টাকার লেনদেনে স্বয়ংক্রিয় পর্যালোচনা শুরু হয়?

২০ লক্ষ থাই বাত বা তার বেশি নগদ লেনদেন এবং ৫০ লক্ষ থাই বাতের বেশি সম্পদ (বৈধ উত্তরাধিকার বাদে) এখন ল্যান্ড কোডের আর্টিকেল ৭৪ অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থের উৎস যাচাইয়ের আওতায় আসে।

নমিনি ব্যবস্থার জন্য কি জেল হতে পারে?

ল্যান্ড কোডের আর্টিকেল ৯৬ অনুযায়ী কোনো বিদেশিকে অবৈধভাবে জমি পেতে সাহায্য করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল ও ২০,০০০ থাই বাত পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে ফৌজদারি মামলা বিরল ছিল, তবে নতুন নজরদারিতে ঝুঁকি বেড়েছে।