মূল বিষয়বস্তুতে যান
গাইড

ব্যাংককে ৩৩টি ভিলা কেলেঙ্কারি: বিদেশি সম্পত্তি ক্রেতাদের জন্য ২০২৬ সালের সতর্কবার্তা

ব্যাংককে ৩৩টি ভিলা কেলেঙ্কারি: বিদেশি সম্পত্তি ক্রেতাদের জন্য ২০২৬ সালের সতর্কবার্তা
Photo: Mikhail Nilov / Pexels
সংক্ষেপে

চীনা নাগরিকদের নমিনি কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংককে ১.২৭৫ বিলিয়ন বাহতের বিলাসবহুল বাড়ি কেনার চক্র ভেঙে দিয়েছে থাই পুলিশ। বাংলাদেশি ও ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য এর অর্থ হলো, থাইল্যান্ডে সম্পত্তি কিনতে হবে সম্পূর্ণ আইনি পথে।

থাইল্যান্ডে সম্পত্তি কিনতে চাওয়া প্রতিটি বিদেশি ক্রেতার জানা দরকার: শুধু কোম্পানি খুলে জমির মালিকানা 'ঘুরপথে' নেওয়ার কৌশল এখন থাই কর্তৃপক্ষের প্রধান নজরদারির বিষয়। সম্প্রতি ব্যাংককে ৩৩টি বেনামি কোম্পানির মাধ্যমে চীনা নাগরিকদের কেনা ১.২৭৫ বিলিয়ন বাহত (প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি জব্দ করেছে পুলিশ। এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন কেসের সংবাদ নয়, বরং থাইল্যান্ড জুড়ে নমিনি স্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে চলমান বড় অভিযানের একটি অংশ মাত্র।

যারা ব্যাংকক বা ফুকেটে সম্পত্তি কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এখনই সময় ঝুঁকি নিয়ে বাস্তবসম্মত হিসাব কষার।

ঘটনাটি আসলে কী ঘটেছিল?

থাই পুলিশ একটি নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে, যেখানে ৩৩টি কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংককের অভিজাত এলাকায় ৩৩টি বিলাসবহুল বাড়ি কেনা হয়েছিল, যার মোট মূল্য ১.২৭৫ বিলিয়ন বাহতেরও বেশি। পদ্ধতিটি ছিল খুবই পরিচিত এক কৌশল: একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী থাই নমিনি শেয়ারহোল্ডার দিয়ে একটি থাই কোম্পানি নিবন্ধন করেন, এরপর সেই কোম্পানির নামে জমি ও বাড়ি কেনেন, যাতে সরাসরি বিদেশি জমি মালিকানার উপর নিষেধাজ্ঞা এড়ানো যায়।

দ্য নেশন থাইল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই সম্পত্তিগুলো ব্যাংককের অভিজাত এলাকায় অবস্থিত এবং প্রতিটি বাড়ির গড় মূল্য প্রায় ৩৮.৬ মিলিয়ন বাহত (১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি)।

থাইল্যান্ডে বিদেশিদের জমি কেনা আইনত কেন নিষিদ্ধ?

১৯৫৪ সালের ল্যান্ড কোড অ্যাক্টের সেকশন ৮৬ অনুযায়ী বিদেশিদের সরাসরি জমির মালিকানা নিষিদ্ধ। এই আইন গত ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে অপরিবর্তিত আছে, এবং থাইল্যান্ডে দীর্ঘদিন বসবাসকারী বা এলিট ভিসাধারীদের জন্যও কোনো ছাড় নেই।

এর পাশাপাশি ১৯৯৯ সালের ফরেন বিজনেস অ্যাক্ট (FBA) অনুযায়ী, জমি সংক্রান্ত লেনদেনসহ নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায় থাই কোম্পানিতে বিদেশি মালিকানা সর্বোচ্চ ৪৯%-এ সীমাবদ্ধ। যেসব ক্ষেত্রে থাই শেয়ারহোল্ডাররা প্রকৃত কোনো পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়াই কাগজে-কলমে মালিক হয়ে থাকেন, অর্থাৎ 'নমিনি' ব্যবস্থা, তা থাই আইনে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

এই অভিযান কি শুধু ব্যাংককেই সীমাবদ্ধ?

মোটেও না। ফুকেট, ফাং এনগা এবং ক্রাবিতে চালানো একটি সমান্তরাল 'ফেজ-৩' অভিযানে ৫০০-র বেশি কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছিল, ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, ৬০টি স্থানে তল্লাশি চালানো হয়, এবং জমি ও শেয়ারহোল্ডিং কাঠামোর সাথে যুক্ত ৭৭টি কোম্পানি তদন্তের আওতায় আসে, যেখানে প্রায় ১.০৫৩ বিলিয়ন বাহত মূল্যের সম্পদ জড়িত ছিল।

সারা দেশজুড়ে এই নজরদারির ব্যাপ্তি আরও বড়। শুধু সামুই ও পাংগানেই ১১,৪০০-র বেশি বিদেশ-সংশ্লিষ্ট কোম্পানি পর্যালোচনার আওতায় এসেছে। সারা থাইল্যান্ডে ৭,০০০-র বেশি কোম্পানি পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ৮৫০-রও বেশি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রের আনুমানিক ক্ষতি ধরা হচ্ছে ১৫ বিলিয়ন বাহত।

ফুকেটে সম্পত্তি খুঁজছেন এমন বাংলাদেশি বা ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য এই তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ থাইল্যান্ড সম্পত্তি-র মতো এজেন্সিগুলোর কাছে প্রতিনিয়ত এমন ক্রেতারা আসেন যারা আগে ভুল তথ্যে ভরসা করে ঝুঁকিপূর্ণ নমিনি কাঠামো বেছে নিয়েছিলেন।

নমিনি স্ট্রাকচার ব্যবহারের শাস্তি কী?

নমিনি স্কিমে ধরা পড়লে শাস্তি বেশ কঠোর:

  • সর্বোচ্চ ১ মিলিয়ন বাহত জরিমানা
  • সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড
  • ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের নির্দেশে ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পত্তি বাধ্যতামূলক বিক্রি

জব্দ হওয়া সম্পত্তির ক্ষেত্রে ল্যান্ড ডিপার্টমেন্ট ১৮০ দিনের মধ্যে বাধ্যতামূলক বিক্রির নির্দেশ জারি করে। মালিক স্বেচ্ছায় বিক্রি করতে ব্যর্থ হলে সম্পত্তি নিলামে ওঠে। জরিমানা ও খরচ বাদ দিয়ে বাকি অর্থ মালিককে ফেরত দেওয়া হয়, তবে নিলামের দাম সাধারণত বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম হয়ে থাকে।

এটা কি শুধু চীনা বিনিয়োগকারীদের সমস্যা?

একদমই না। এই আইন সব দেশের বিদেশি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, কোনো ব্যতিক্রম নেই। এর আগেও রাশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা হয়েছে, বিশেষত ফুকেট ও কোহ সামুইতে। চীনা নেটওয়ার্কটি এর বিশাল আকারের কারণে বেশি মনোযোগ পেয়েছে, তবে ফুকেট, ফাং এনগা ও ক্রাবিতে সমান্তরাল অভিযান প্রমাণ করে যে প্রয়োগ ব্যবস্থা সর্বজনীন। বাংলাদেশি বা ভারতীয় বিনিয়োগকারীরাও এই আইনের বাইরে নন।

কর্তৃপক্ষ কেন এখন এতটা কঠোর হচ্ছে?

বেশ কয়েকটি বিষয় একসাথে ঘটেছে। বিলাসবহুল সম্পত্তির দাম বাড়ার সাথে সাথে গণমাধ্যম ও জনসাধারণের নজরও বেড়েছে। 'বিদেশিদের কাছে জমি বিক্রি' নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য পার্লামেন্টে জোরালো হয়ে উঠেছে। এছাড়া ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন (DSI) অতিরিক্ত অর্থায়ন ও উন্নত ডিজিটাল টুল পেয়েছে সন্দেহজনক কর্পোরেট কাঠামো ট্র্যাক করার জন্য, যা ব্যাংকক থেকে ফুকেট ও দক্ষিণের দ্বীপ পর্যন্ত ধাপে ধাপে চলা অভিযানে স্পষ্ট।

ব্যাংককের কোন এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি নজরদারিতে?

ব্যাংককের প্রাইম এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি নজরে আছে: সুখুমভিট, সাথর্ন, থংলর, এবং বাং না ও রামখামহায়েং এলাকার গেটেড হাউজিং এস্টেট (মু বান)। ২০ মিলিয়ন বাহতের বেশি মূল্যের সম্পত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যালোচনার জন্য চিহ্নিত হয়।

তাহলে বৈধভাবে থাইল্যান্ডে সম্পত্তি কেনার উপায় কী?

আশার কথা হলো, সম্পূর্ণ বৈধ পথে এখনো থাইল্যান্ডে সম্পত্তি কেনা সম্ভব:

  • ফ্রিহোল্ড কনডোমিনিয়াম: ভবনের মোট ফ্লোর এরিয়ার ৪৯% বিদেশি মালিকানার কোটা শেষ না হলে, বিদেশিরা সরাসরি ফ্রিহোল্ড শিরোনামে কনডো ইউনিট কিনতে পারেন।
  • দীর্ঘমেয়াদি লিজহোল্ড (৩০+৩০+৩০ বছর): ভিলার ক্ষেত্রে এটি একটি স্বীকৃত আইনি বিকল্প। প্রথম ৩০ বছরের মেয়াদ সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদের নবায়ন নির্ভর করে চুক্তির শর্ত ও জমির মালিকের সদিচ্ছার উপর, তাই একজন যাচাই-বাছাই করা আইনজীবী দিয়ে সুচিন্তিতভাবে চুক্তি তৈরি করা জরুরি।
  • BOI-সংশ্লিষ্ট কাঠামো: নির্দিষ্ট বিনিয়োগ শর্ত পূরণ করলে বোর্ড অফ ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে কিছু বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়।

২০২৪-২০২৫ সালে সরকার একটি বিল নিয়ে আলোচনা করেছিল, যাতে বিদেশিরা ন্যূনতম ৪০ মিলিয়ন বাহত বিনিয়োগের শর্তে সর্বোচ্চ ১ রাই (১,৬০০ বর্গমিটার) জমি কিনতে পারবেন। তবে রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে প্রস্তাবটি আটকে যায়, তাই বর্তমানে এটি কোনো বাস্তবায়িত বিকল্প নয়।

বিনিয়োগকারীরা কীভাবে নিজেদের মূলধন আইনগতভাবে সুরক্ষিত রাখতে পারেন?

তিনটি ধাপ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ৪৯% বিদেশি মালিকানা কোটার মধ্যে ফ্রিহোল্ড শিরোনামে কনডোমিনিয়াম কেনা। দ্বিতীয়ত, ভিলায় আগ্রহ থাকলে একজন যাচাইকৃত আইনজীবীর মাধ্যমে লিজহোল্ড কাঠামো ব্যবহার করা। তৃতীয়ত, ডেভেলপারের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই এমন স্বাধীন আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিটি সম্পত্তির ডিউ ডিলিজেন্স করানো।

এই খবরের সারমর্ম কী?

এই তদন্ত কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, বরং থাই কর্তৃপক্ষের একটি পদ্ধতিগত নীতিগত অবস্থানের অংশ। দশকের পর দশক ধরে চলা নমিনি কাঠামো এখন অগ্রহণযোগ্য মাত্রার ঝুঁকি বহন করে। ব্যাংকক বা দ্বীপাঞ্চলে সম্পত্তি কেনার পরিকল্পনা করা প্রতিটি বিনিয়োগকারীর জন্য একমাত্র নিরাপদ পথ হলো কঠোরভাবে বৈধ মালিকানা কাঠামো অনুসরণ করা।

তবে এর মানে এই নয় যে থাইল্যান্ডের বাজার আকর্ষণীয় নয়। কনডোমিনিয়ামে বার্ষিক ভাড়া আয় (রেন্টাল ইল্ড) সাধারণত ৫-৭% পর্যায়ে থাকে, এবং প্রবেশ খরচ সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু মূলধন সুরক্ষার শুরুটা হয় সঠিক ডিল স্ট্রাকচার দিয়ে, বাংলাদেশি বা ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য এই শিক্ষাটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট

সাধারণ প্রশ্ন

থাইল্যান্ডে বিদেশিরা কি সরাসরি জমি বা বাড়ি কিনতে পারেন?

না, ১৯৫৪ সালের ল্যান্ড কোড অ্যাক্টের সেকশন ৮৬ অনুযায়ী বিদেশিরা সরাসরি জমির মালিকানা নিতে পারেন না। বিকল্প হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি লিজহোল্ড (৩০+৩০+৩০ বছর) নিয়ে বাড়ির কাঠামো আলাদাভাবে মালিকানায় রাখা যায়, অথবা নির্দিষ্ট শর্তে থাই স্ত্রী/স্বামীর মাধ্যমে কেনা যায়। তবে কনডোমিনিয়াম ফ্রিহোল্ড শিরোনামে সরাসরি কেনা সম্পূর্ণ বৈধ।

নমিনি কোম্পানি দিয়ে সম্পত্তি কিনলে কী শাস্তি হতে পারে?

ফরেন বিজনেস অ্যাক্ট অনুযায়ী ধরা পড়লে সর্বোচ্চ ১ মিলিয়ন বাহত জরিমানা, সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং ল্যান্ড ডিপার্টমেন্টের নির্দেশে ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পত্তি বাধ্যতামূলক বিক্রির শাস্তি হতে পারে। বিক্রি না হলে নিলামে তোলা হয়, যেখানে দাম বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম থাকে।

বাংলাদেশি বা ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য এই ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা কী?

এই আইন সব বিদেশি নাগরিকের জন্য সমান, কোনো ব্যতিক্রম নেই। আগে রাশিয়া, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের মামলা হয়েছে। তাই বাংলাদেশি বা ভারতীয় ক্রেতাদের উচিত ফ্রিহোল্ড কনডো বা যথাযথ লিজহোল্ড চুক্তির মতো বৈধ পথ বেছে নেওয়া, নমিনি কোম্পানি এড়িয়ে চলা।

লিজহোল্ড কি নমিনি কোম্পানির চেয়ে নিরাপদ বিকল্প?

হ্যাঁ, ৩০ বছরের নবায়নযোগ্য লিজহোল্ড থাই আইনে স্বীকৃত একটি বৈধ চুক্তি এবং প্রথম ৩০ বছরের মেয়াদ পুরোপুরি সুরক্ষিত। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় নবায়ন নির্ভর করে চুক্তির শর্ত ও জমির মালিকের সদিচ্ছার উপর, তাই একজন স্বাধীন ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে চুক্তি খুঁটিয়ে দেখা জরুরি।